ভুল ভালবাসা

ভুল করে ভালবেসে- 
ভুল বুঝে দূরে গেলেও কি;
মনের ভুলেও ভোলা যায় 
ভুল ভালবাসাকে?

গবেষণা

অভিজিৎ রায়, সহকারী অধ্যপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণা কি?
সাধারণ অর্থে গবেষণা জ্ঞানের অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণাকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর নির্দিষ্ট তথ্য লাভের বৈজ্ঞানিক এবং পদ্ধতিগত
অনুসন্ধানও বলা যায়। আসলে
, গবেষণা হল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি শিল্প।
Redman এবং Mory গবেষণাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘‘নতুন জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতিমূলক চেষ্টা
কিছু ব্যক্তিরা মনে করেন গবেষণা একটি ধারা, অজানা থেকে জানার দিকে ধাবিত
একটি গতি। গবেষণা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম
, এমনকি কৌশলগত ধারণার
ক্ষেত্রে এই টার্মটি ব্যবহার করা উচিত।
Clifford
Woody
এর মতে, ”গবেষণার অন্তর্ভুক্ত হল
সমস্যার সংজ্ঞায়ন ও পুন:সংজ্ঞায়ন
, পূর্বানুমান তৈরি অথবা সম্ভাব্য সমাধানগুলো সংগ্রহ করা, সংগঠন করা ও প্রাপ্ত তথ্যের
মূল্যায়ন করা
; অবরোহ তৈরি করা ও ফলাফলে পৌঁছানো এবং পরিশেষে ফলাফল সাবধানে পরীক্ষা করার
মাধ্যমে সংগঠিত পূর্বানুমানের সাথে খাপ খায় কিনা তা নির্ধারণ করা।
(Kothari 2004:1)
কেন গবেষণা?
  • কিছু সৃজনশীল কাজের
    মধ্য দিয়ে জ্ঞান লব্ধ আনন্দ পাওয়ার ইচ্ছা
    ,
  • সমাজের সেবা করার ইচ্ছা,
  • প্রায়গিকভাবে কোন
    সমস্যার সমাধান খোঁজার ইচ্ছা
    ,
  • একটি গবেষণার ডিগ্রী
    অর্জন এবং ফলাফলসরূপ লাভের ইচ্ছা
    ,
  • শ্রদ্ধাভাজন হওয়ার
    ইচ্ছা
    ,
  • পুরাতনকে খোঁজা এবং
    নতুনকে সনাক্ত করা
    ,
  • জনমত তৈরীর জন্য
    শিক্ষামূলক কার্যক্রম
    ,
  • বিদ্যমান কোন বিষয়ের
    সত্যতা যাচাই করা।
গবেষণার লক্ষ্য কি?
গবেষণার উদ্দেশ্য হল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া প্রয়োগের মধ্য দিয়ে প্রশ্নগুলোর
উত্তর আবিস্কার করা।গবেষণার মুল লক্ষ্য লুকিয়ে থাকা সত্যকে
,যা এখনও আবিস্কৃত হয়নি তা
খুঁেজ বের করা।যদিও প্রতিটি গবেষণা অধ্যায়নের কিছু নির্দিষ্ট  লক্ষ্য থাকে
,নি¤œ উল্লেখিত ভাগগুলোকে
বিস্তারিতভাবে গবেষণার লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিতে পারি-
  • একটি প্রপঞ্চ সর্ম্পকে
    পরিচিতি লাভ করা অথবা তার মধ্য দিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা।
  • একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি,
    অবস্থা ও দলের
    বৈশিষ্ট্যসমূহের বর্ণনা করা।
  • কোন কিছু ঘটে যাওয়ার
    মাত্রা অথবা তার সাথে সর্ম্পকিত অন্য কিছুকে নির্ধারণ করা।
·        
চলকগুলোর মধ্যে অপরিকল্পিত
সর্ম্পকগুলোকে পুর্বানুমান করার জন্য পরীক্ষা করা।
(Kothari
2004:2)
গবেষণায় মূলত ৮
ধরনের লক্ষ্য হতে পারে-
  • আবিস্কার
  • বর্ণনা
  • বোঝাপড়া
  • ব্যাখ্যা
  • অনুমান
  • পরিবর্তন
  • মূল্যায়ন
  • প্রভাবসমূহ নির্ধারণ
গবেষণা নকশা তৈরী :
একজন গবেষককে বা গবেষক দলকে একটি গবেষণা কর্ম পরিচালনার পূর্বে কিছু
সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়।
গবেষণার তাৎর্পয কি?
  • পরিকল্পনার ক্ষেত্রে
    গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
  • কোন প্রপঞ্চ
    নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দান করতে পারে।
  • সমাজ সংস্কারমূলক কাজে
    ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।
  • মানুষের মূল্যবোধ,
    অভিমুখীনতা ও
    কুসংস্কারকে দূরীভূত করতে প্রয়োজনীয় ঐক্যমতের ভিত্তি সৃষ্টি করতে পারে।
  • জীবনযাত্রার মান
    বৃদ্ধির জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে।
  • প্রযুক্তির বিকাশ,
    গ্রহণ ও
    স্থায়িত্ব প্রদানে সামাজিক সহায়তার ভিত্তি প্রস্তুত করতে পারে।
  • বিজ্ঞানের ও বিশ্বাসের
    সামাজিক প্রভাব
    , প্রতিপত্তি ও দ্বন্দ্বকে মূল্যায়নের মাধ্যমে বিজ্ঞানের দর্শন ও বিজ্ঞানের
    সমাজতত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে।
  • প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মত
    সঠিক ও যথেষ্ট ভবিষ্যতবাণী করতে না পারলেও সীমিত ক্ষেত্রে সংস্কৃতি ও
    পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতবাণী করতে পারে।
সামাজিক গবেষণা:
সামাজিক গবেষণা কি?
সামাজিক গবেষণা বলতে সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণাকে বুঝানো হয়ে
থাকে। সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের বিষয়বস্তু মানুষ
, মানুষের মন, মানুষের সমাজ, মানুষের সংস্কৃতি, মানুষের অর্থনীতি, মানুষের রাজনীতি প্রভৃতি।
মোট কথা মানুষ
, তার আচরণ ও ক্রিয়া, এবং মানুষের সমাজ-সংগঠন সামাজিক বিজ্ঞানীদের সাধারণ বিষয়বস্তু। একারণে সামাজিক
গবেষণা বলতে শুধু সমাজতাত্ত্বিক গবেষনাকে ধরে নেয়া ঠিক নয়। তাছাড়া
, সামাজিক বিজ্ঞানের পদ্ধতি
এবং পদ্ধতিতত্ত্বে যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকায় সামাজিক গবেষণা বিষয়ক আলোচনায় সাধারণত
ব্যাপক দৃষ্টিকোণ লক্ষ্য করা যায়। আমরা সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার উপর কোন কোন
ক্ষেত্রে বিশেষ গুর
ত্ব দিলেও এখানে সামাজিক গবেষণা বলতে সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণাকেই বুঝানো হবে।
বলা বাহুল্য
, সামাজিক গবেষণা বলতে সামাজিক বিষয়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেই বুঝতে হবে। (মুহাম্মদ
হাসান ইমাম ১৯৯৮:১০৬)
সামাজিক গবেষণার বৈশিষ্ট্য:
সামাজিক গবেষণার কতক বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যদিও একথা বলার অপেক্ষা
রাখে না যে সব প্রাকৃতকি বিজ্ঞানেও অনেকগুলো অভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। নি
¤œ প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো
বর্ণনা করা হল:
  • সামাজিক সমস্যা সমাধানে
    সহায়ক
  • সামাজিক গবেষণা দু ইবা
    ততোধিক চলকের (
    variable) মধ্যে সম্পর্ক
    আবিষ্কার করে
  • সামাজিক অবস্থা
    সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করে
  • সামাজিক গবেষণা বাস্তব
    তথ্য নির্ভর
  • সামাজিক গবেষণা
    ধারাবাহিক ও সুশৃঙ্খল
  • সামাজিক গবেষণা সঠিক
    তত্ত্ব গঠনে ব্যাপ্ত
  • সামাজিক গবেষণা
    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ করে।
(ড. খুরশিদ আলম ২০০৩:৯২)
সামাজিক গবেষণার প্রকারভেদ:
কোন নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা বা কোন অজানা
বিষয়ে জানার চেষ্টা করা।  বস্তুত গবেষণাকে
নি
¤œক্ত প্রকারভেদে ভাগ
করা যায়
, যেমন:
  • মৌলিক গবেষণা (Basic or fundamental research)
  • ফলিত গবেষণা (Applied research)
  • কার্যোপযোগী গবেষণা (Operational research)
  • মূল্যায়ন গবেষণা (Evaluative research)
  • পরীক্ষনমূলক গবেষণা (Experimental research)
  • জরিপ গবেষণা (Survey research)
  • মাঠপর্যায়ের
    অনুসন্ধানমূলক গবেষণা
    (Field investigative research)
(ড. খুরশিদ আলম ২০০৩:৯৬)
মৌলিক গবেষণা:
যে গবেষণার দ্বারা কোন তত্ত্বের ও পূর্বানুমানের উন্নয়ন ও পরীক্ষা করা হয়
অনুসন্ধানকারীর জ্ঞানের স্থান পূরণের উদ্দেশ্যে এবং যার কিনা ভবিষ্যতে সামাজিক
প্রায়োগিক দিক থাকবে
, কিন্তু বর্তমানের সমস্যা সমাধানের কোন প্রায়গিক দিক নেই তাই মৌলিক গবেষণা। (ড.
খুরশিদ আলম ২০০৩:৯৭) এক কথায় বললে যে গবেষণার দ্বারা জ্ঞানের সংগ্রহ হয় জ্ঞান
লাভের উদ্দেশ্যে তাই মৌলিক গবেষণা।
(Kothari
2004:3)
বস্তুত মৌলিক
গবেষণা নি
¤œবর্ণিত দুটি কাজ সম্পন্ন করে।
১.    নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার
২.    বিদ্যমান তত্ত্বের উন্নয়ন
ফলিত গবেষণা:
ফলিত গবেষণা হচ্ছে সেই গবেষণা যার দ্বারা সামাজিক সমস্যা সমাধান সম্ভব,
যে সমস্যাগুলো
সমসাময়িক উদ্বিগ্নের বিষয়। অর্থাৎ ফলিত গবেষণার লক্ষ্যই হচ্ছে সেই সকল সমস্যা
সমাধান পাওয়া যা কিনা কোন সমাজ বা প্রতিষ্ঠানে ঘটছে।
(Kothari 2004:3) তাত্ত্বিক গবেষণা ও ফলিত
গবেষনা পরষ্পর সম্পর্কিত
, কারণ তাত্ত্বিক গবেষণা ফলিত গবেষণার পথপ্রদর্শক।
কার্যোপযোগী গবেষণা:
কার্যোপযোগী গবেষণা হচ্ছে ক্ষুদ্র পরিসরের কোন সমস্যা সমাধান ও যৌক্তিক
সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে গবেষণা পরিচালিত হয়। ফলিত গবেষণার সাথে এর মৌলিক
পার্থক্য হল কার্যোপযোগী গবেষণা সম্পাদিত হয় ক্ষুদ্র পর্যায়ে আর ফলিত গবেষণা
সম্পাদিত হয় বৃহৎ পর্যায়ে।  (ড. খুরশিদ আলম
২০০৩:৯৮)
মূল্যায়ন গবেষণা:
মূল্যায়ন গবেষণা পরিচালিত হয় কোন কিছুকে যেমন উন্নয়ন কর্মসূচী ও প্রকল্পকে
মূল্যায়ন করার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ যে গবেষণা দ্বারা কোন প্রকল্পের কার্যকারিতা দেখা
হয় তাই মূল্যায়ন গবেষণা।
পরীক্ষণমূলক গবেষণা:
পরীক্ষণমূলক গবেষণা হচ্ছে একটি স্বাধীন চলককে নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে,
যখন অন্যান্য অধীন চলকের
উপর এর প্রভাব দেখা হয়। আর এখানে নিয়ন্ত্রণে রাখার অর্থ হচ্ছে ঐ চলকটিকে ধ্র
ব ধরা।
জরিপ গবেষণা:
জরিপ গবেষণা হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, দল বা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন
সমস্যা
, আলোচিত বিষয় ও ঘটনার
বিশ্লেষণ। আর সেই বিষয়গুলো হতে পারে কখনো মতামত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আবার কখনো
সমস্যা ধরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানমূলক গবেষণা:
গবেষক যখন কোন সমস্যা বা বিষয়কে নিয়ে জানতে গিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালান তখন
তা মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানমূলক গবেষণা হয়।
(ড. খুরশিদ আলম ২০০৩:৯৮-১০১)
গবেষণার অন্যান্য শ্রেণী বিভাগ:
উপরে আলোচিত গবেষণার প্রকারভেদ ছাড়াও গবেষণাকে আরও শ্রেণীবিভাগে বিভক্ত করা
যায়
, যেমন:
·        
বর্ণনামূলক গবেষণা বনাম
বিশ্লেষণমূলক গবেষণা
(Descriptive
vs. Analytical research
)
·        
গুণগত গবেষণা বনাম পরিমাণগত
গবেষণা
(Qualitative
vs. Quantitative research
)
·        
ধারণাভিত্তিক গবেষণা বনাম
সরেজমিনে গবেষণা
(Conceptual
vs. empirical research
)
বর্ণনামূলক গবেষণা বনাম বিশ্লেষণমূলক গবেষণা:
বর্ণনামূলক গবেষণার দ্বারা বিভিন্ন জরিপ এবং অনুসন্ধান চালানো হয় বিভিন্ন ঝটনা
উৎঘাটনের জন্য। এই গবেষণার লক্ষ্য হল বর্তমানে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে বর্ণনা করা। আর এর
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল
, এই গবেষণায় গবেষকের চলকের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, কেবলমাত্র বর্ণিত হয় যা
ঘটেছে বা ঘটে চলছে। অন্যদিকে বিশ্লেষণমূলক গবেষণা হচ্ছে  যেখানে আগেই ঘটনা উপস্থাপিত থাকে
, আর এই গবেষণার দ্বারা সেই
ঘটনার সূক্ষ্ম মূল্যায়ন ঘটে।
গুণগত গবেষণা বনাম পরিমাণগত গবেষণা:
গুণগত গবেষণা হচ্ছে যেখানে কোন কিছুর গুণকে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে পরিমাণগত
গবেষণার ভিত্তি হচ্ছে সংখ্যাবাচক পর্যালোচনা। অর্থাৎ সংখ্যাবাচক পর্যালোচনার
মাধ্যমে কোন ঘটনা বা বিষয়কে ব্যাখ্যা করা। যা কিনা গুণগত গবেষণায় গুণকে পর্যালোচনা
করা হয়।
ধারণাভিত্তিক গবেষণা বনাম সরেজমিনে গবেষণা:
ধারণাগত গত গবেষণার সাথে
ভাবনা এবং তত্ত্ব সম্পর্কিত। এই গবেষণা সাধারণত দার্শনিক এবং চিন্তাবীদরা করে
থাকেন
, যার মাধ্যমে তাঁরা
নতুন কোন তত্ত্ব বা বিদ্যমান কোন বিষয়কে ব্যাখ্যা করে থাকেন। অন্যদিকে সরেজমিনে
গবেষণা হচ্ছে পুরোটাই অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে
, কখনো কোন পদ্ধতি কিংবা
তত্ত্বের উপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই। ইহা তথ্য নির্ভর গবেষণা।
(Kothari 2004:3-4)
গবেষণা প্রক্রিয়া:
  • গবেষণা সমস্যার
    সংজ্ঞায়ন
  • সাহিত্য পর্যালোচনা
  • অধ্যায়নের সামগ্রিকতা ও
    একক নির্ধারণ
  • পুর্বানুমানের আকার গঠন
    ও চলক নির্ধারণ
  • গবেষণা কৌশল ও পদ্ধতি
    নির্ধারণ
  • পরিসংখ্যানিক অথবা অন্য
    পদ্ধতি গ্রহণ
  • তথ্য সংগ্রহ
  • তথ্য বিশ্লেষণ
  • ব্যাখ্যা দেওয়া ও
    বিবরণী
    (Report) লেখা
গবেষণা সমস্যার সংজ্ঞায়ন:
সাধারণত গবেষণার সমস্যা হচ্ছে কোন গবেষক তাত্ত্বিক কিংবা বাস্তবিক অভিজ্ঞতার
মধ্যদিয়ে জটিলতায় পড়লে যা সমাধান বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর গবেষণার প্রথম
ধাপই হচ্ছে গবেষণার জন্য সমস্যা নির্ধারণ এবং গবেষণার সমস্যাকে পরিষ্কাররূপে
বর্ণনা করা। আর এই সমস্যা কখনো গবেষকের আগ্রহ থেকে আসে আবার কখনো তত্ত্বের উপরও
নির্ভর করে। আর সমস্যার উপর নির্ভর করে গবেষণার ক্ষেত্র নির্বাচন করেন একজন গবেষক।
সাহিত্য পর্যালোচনা:
গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যেই মূলত  গবেষণায় সাহিত্য পর্যালোচনা করা হয়, কিন্তু তার থেকেও বেশি গুরত্বপূর্ণ একটি কার্যকরী
গবেষণা পদ্ধতি গ্রহণ করা। আর সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদপত্র
, সম্মেলনের আলাপ-আলোচনা,
সরকারি প্রতিবেদন,
বই, ইন্টারনেট ইত্যাদি
পর্যালোচনা করা হয়। সাধারণত দুই ধরণের সাহিত্য পর্যালোচনা করা যায়
, যেমন: তত্ত্ব ও ধারণা লব্ধ
সাহিত্য এবং পূর্ব অভিজ্ঞতালব্ধ অধ্যয়নের সাহিত্যসমূহ।
অধ্যায়নের সামগ্রিকতা ও একক নির্ধারণ:
তথ্য সংগ্রহের পূর্বেই আমাদের অধ্যায়নের সামগ্রিকতা ও একক নির্ধারণ করতে হবে।
অধ্যয়নের সামগ্রিকতা নির্ধারণের কারণ হচ্ছে এর মাধ্যমে  বাহ্যিক আকার এবং সামাজিক এককগুলো অধ্যয়ন করা
সম্ভব হবে। যার জন্য করা হয়ে থাকে
, প্রাক-অধ্যয়ন ও নমুনা নির্ধারনের মত বিষয়গুলো।
পুর্বানুমানের আকার গঠন ও চলক নির্ধারণ:
গবেষণার যৌক্তিকতা নির্ধারণের জন্য গবেষণার আপাত ধারণা নির্ধারণ করাই গবেষণার
পূর্বানুমান বলা হয়। আর গবেষণার পূর্বানুমানের উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে গবেষণার
অনুসন্ধানের পথনির্দেশক সরূপ। সাধারণত একটি পূর্বানুমানের কিছু চলক থাকে
, যার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন চলকের
মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তা দেখা হয়। আর সেই সম্পর্ক কখনো হয় ধণাত্মক
, আবার কখনো ঋণাত্মক ও কখনো বা
শূন্য।
গবেষণা কৌশল ও পদ্ধতি নির্ধারণ:
গবেষকের জানার আগ্রহের জায়গা সম্পর্কে অবগত হলে, গবেষকের পরবর্তি যে চিন্তা
আসে তা হল কি করে আগ্রহের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। আর তখনই প্রয়োজন হয়ে পরে একজন
গবেষককে গবেষণার কৌশল ও পদ্ধতি নির্ধারণের। উদাহরণ সরূপ: গবেষণার জন্য সামগ্রিক
তথ্য আনয়নের জন্য প্রশ্ন পত্রের সরূপ তৈরি থেকে শুর
করে সাক্ষাৎকার গ্রহণের নানা
কৌশল নির্ধারণ করা ইত্যাদি।
পরিসংখ্যানিক অথবা অন্য পদ্ধতি গ্রহণ:
তথ্য সংগ্রহ:
কখনো সামাজিক গবেষণায় দরকার হয়ে পড়ে ভিন্ন সম্প্রদায়কে জানা, সেক্ষেত্রে গবেষককে অনেক
প্রস্তুতি নিতে হয় ভিন্ন সমাজে ঢুকার জন্য। তারপর গবেষক তথ্য সংগ্রহ শুর
করেন, আর সেই তথ্য হয় দুই ধরণের।
যেমন
, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক
তথ্য। প্রাথমিক তথ্য হচ্ছে যা গবেষক তার গবেষণা ক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করেন
, আর মাধ্যমিক তথ্য হচ্ছে যা
গবেষক কোন মাধ্যমিক উৎস (বই
, ইন্টারনেট..) থেকে সংগ্রহ করেন।
তথ্য বিশ্লেষণ:
তথ্য সংগ্রহের পর একজন গবেষক তথ্যের বিশ্লেষণ করে থাকেন। আর তখন পড়ফরহম, ঃধনঁষধঃরড়হ এর মত কৌশলগুলো
অবলম্বন করেন একজন গবেষক তথ্যকে বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে। মাঝে মাঝে তথ্য সংগ্রহের
ধরণই ঠিক করে দেয় যে তথ্য বিশ্লেষণ কিরূপ হবে।
ব্যাখ্যা দেওয়া ও বিবরণী (Report)
লেখা:
গবেষণার ব্যাখ্যা বা বিবরণী লেখার সময় গবেষককে গবেষণার নৈতিকতার ব্যাপারে
খেয়াল রাখতে হয়
, আরও বিশেষ করে যখন গবেষণাটি হয় কোন স্পর্শকাতর বিষয়কে নিয়ে। যখন কোন সামাজিক
বাস্তবতা উৎঘাটনে কোন গবেষক তাঁর গবেষণা করেন
, তখন উচিত সেই সমাজের গোপনীয়
বিষয় নিয়ে খেলা না করা
, কারণ সেই জনগোষ্ঠী কেবলমাত্র গবেষকের কাছে অধ্যায়নের বিষয়বস্তু নয় তার থেকেও
বেশি কিছু।
গবেষণার নৈতিকতা:
গবেষণার নৈতিকতার নিয়ম হিসাবে নিচে আলোচিত বিষয়গুলোকে ধরা হয়,
  • স্বেচ্ছামূলক অংশগ্রহণ।
    গবেষণায় অংশগ্রহণ কখনোই জোড় করে করানো যাবে না
    , এবং যদি কেউ অংশগ্রহণ
    করতেও আগ্রহী হয় তাহলে তাকে জানাতে তার গবেষণা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার
    অধিকারও তার আছে।
  • গবেষণায়
    অংশগ্রহণকারীদের জানানো। যারা গবেষণায় অংমগ্রহণ করবে তাদের অবশ্যই গবেষণার
    প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্যে সম্পর্কে জানবে। তাছাড়া গবেষণায় যে পদ্ধতি ব্যবহার করা
    হচ্ছে
    , কেন তাদের এই গবেষণার সাথে জড়িত করা হচ্ছে এবং গবেষণার ফলাফল ব্যবহারের
    উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে তাদের জানানো হবে।
  • গবেষণায় অংশগ্রহণ কারীর
    ধারণার অবমূল্যায়ন না করা। গবেষণায় অবশ্যই অংশগ্রহণকারীর দেওয়া তথ্যের
    গোপনীয়তা রক্ষ্যা করতে হবে যেন তথ্যের অবমূল্যায়ন না হয়।

গবেষণায় শুদ্ধতা। গবেষণার অবশ্যই একটা মান থাকবে যা গবেষণাকে অসততা থেকে

‘কৃষি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বারসিক এর সাথে আমার যাত্রা ২০১১ সাল থেকে। প্রথম বার ফেলোশিপ এর মাধ্যমে দ্বিতীয়বার গবেষণা সহকারী হিসেবে ২০১২ সালে এবং সব শেষে ২০১৪ সালে কর্মী হিসেবে। প্রতিবার যখনই জানার চেষ্টা করেছি বারসিক কী নিয়ে কাজ করে। তখন বারবারই সবকিছু ছাঁপিয়ে প্রধান কাজ হিসেবে দেখা দেয় ‘কৃষি’ র নাম। আবার আমি নিজেও যখন অন্য কাউকে বোঝাতে যাই তখন বোঝানোর শেষে সেই ব্যক্তি বলে ওঠেন, ‘‘ও আপনারা কৃষি নিয়ে কাজ করেন”। কিংবা কখনো বোঝানোর কষ্ট না করে বলি কৃষি নিয়ে কাজ করি। কিন্তু, বারবারই মনে হয়েছে, শুধু কৃষি দিয়ে বারসিক কে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিনিধিত্ব করা হয় কি? এই প্রশ্নের উত্তর অনেক দিন খুঁজেছি। তবে মন ভরেনি। অবশেষে, গত বছর বারসিক রামেশ্বরপুর রিসোর্স সেন্টার এ আমি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ল এর নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক অভিজিৎ রায় এবং বারসিক এর সমন্বয়কারী সৈয়দ আলী বিশ্বাস এর সাথে একটি আড্ডার আলোচনা থেকে এর আংশিক উত্তর খুজে পাই। সেদিনকার সেই বোঝাপড়া আমি বারসিক পরিবার এবং শুভাকাংখিদের সাথে শেয়ার করতে আগ্রহ প্রকাশ করছি।
বারসিক ২০০১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রধানত যে কাজটা করে সেটা হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদকে মানুষ কীভাবে জীবনধারনের জন্য চর্চার মধ্য দিয়ে সেটাকে (প্রাকৃতিক সম্পদ) সংরক্ষণ করে। বারসিক তার এই ধারণাগত জায়গাকে স্পষ্ট করার জন্য- মানুষকে বোঝার জন্য যে, মানুষ কীভাবে প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তার জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করছে। এই ৩ বছর মানুষের সেই সমস্ত কৌশল বোঝার চেষ্টা ও ডকুমেন্টেশন করেছে।
এই ৩ বছরের কাজের মধ্য দিয়ে প্রধানত ৩টি বিষয়কে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। যথা:
১)     প্রাকৃতিক সম্পদ,
২)     চর্চা ও ব্যবহার এবং
৩)     সংরক্ষণ।
এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে পারষ্পারিক সম্পর্ক হচ্ছে কৃষি। আর কৃষির সাথে এই সম্পর্ক হচ্ছে জ্ঞান উৎপাদনের সর্ম্পক।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই কৃষি বা কৃষকের জ্ঞান বা সাধারণ জনগণের জ্ঞান কেন বারসিক এর কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ? কেননা আধুনিক জ্ঞান যেখানে কৃষি পন্যের উৎপাদনকে বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি যে কোন সমস্যা সমাধানে আধুনিক জ্ঞান অনেক বেশি কার্যপোযোগি; সেখানে কেন বারসিক এত বেশি সাধারণ মানুষের জ্ঞানকে প্রাধান্য দিচ্ছে?
আমরা সবসময় পড়ে এসেছি, শিখে এসেছি এবং জেনে এসেছি যে, কৃষি হচ্ছে উৎপাদন (প্রোডাকশন) এর বিষয়, বাণিজ্যিক (মার্কেট) বিষয়, কৃষি হচ্ছে লাভ-ক্ষতির বিষয়। পাশপাশি কৃষিকে সমসাময়িক সময়ে সাধারণীকরণ করা হয় খাদ্য নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে।
কিন্তু বারসিক যখন কৃষকের কাছ থেকে ‘কৃষিকে’ বুঝার চেষ্টা করে তখন দেখা যায় কৃষকের কাছে কৃষি শুধুমাত্র উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি একজন কৃষকের কাছে সমগ্র জীবনের বিষয়। কৃষি হচ্ছে সামাজিক বন্ধনের ও সামাজিক সংহতির বিষয়। গ্রামীণ জীবনের পারস্পারিক দ্বন্দ্ব সংঘাত ও সংহতির বিষয়। কেননা কৃষির মধ্যে দিয়েই একটি গ্রামের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং বিরাজ করে। একই সাথে কৃষি হচ্ছে পরিবেশ এবং প্রতিবেশীয় বিষয়। এটি কৃষকের কাছে মাটি ও বাস্তুসংস্থান এর বিষয়। একইসাথে এটি কৃষকের কাছে বৈচিত্র্যের বিষয়। বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার বিষয়, বৈচিত্র্যের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার বিষয়।
কিন্তু কৃষি যখন একজন উন্নয়ন কর্মী/প্রতিনিধি (এজেন্ট) বা একজন গবেষক যখন উপস্থাপন করে তখন সে নিয়ে আসে লাভ-ক্ষতি, কৃষি উপকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো। আর সকল উন্নয়ন এজেন্সী কৃষিকে একইভাবে উপস্থাপন করে। কিন্তু একজন কৃষকের কাছে কৃষির বিষয়টি তার জীবনাদর্শনের সাথে সম্পর্কীত। কৃষক তার কৃষিকে কক্ষনোই ওতোটা সরলীকরণ করে দেখে না। একজন কৃষক যখন তার কৃষিকে তার প্রতিবেশ, তার গ্রাম, তার বৈচিত্র্যময় জীবনযাপনের সাথে আন্তঃসম্পর্ক করে ভাবতে পারে; তখন কোনভাবেই এই কৃষি এবং কৃষকের জ্ঞান উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে না রাখার অবকাশ থাকে না। সুতরাং গ্রামে কাজ করার ক্ষেত্রে এই একটি কারণই যথেষ্ট কৃষি এবং কৃষকের জ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়ার।
তাই বারসিক যখন বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলে তখন এটি আসলে চলে আসে কৃষকের দৃষ্টিতে দেখা বৈচিত্র্যকে। আর কৃষি হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের টিকে থাকার, বেঁচে থাকার জ্ঞান এবং কৌশল। তাই গ্রামের মানুষের সাথে সর্ম্পক স্থাপনের একটি অন্যতম উপায় হচ্ছে কৃষিকেন্দ্রিক কৃষকের চিন্তা দর্শনকে প্রাধান্য দিয়ে সামাজিক সম্পর্ক, পরিবেশ, সমাজনীতি, অর্থনীতি তথা সমাজ কাঠামোকে বোঝা।
বীজ হচ্ছে কৃষির প্রথম এবং প্রধানতম হাতিয়ার। বীজকে কেন্দ্র করেই কৃষির যতধরনের সমস্যার সূচনা; কৃষির ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক যাত্রা। বীজ যখন কৃষকের হাত থেকে বাজারের হাতে চলে গেছে তখন বীজ এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলো নষ্ট হয়ে যায়। একটি গ্রামের মধ্যে যে সামাজিক সংহতি আছে সেগুলো ভেঙে পড়ে। সংহতির সাথে সাথে মানুষে মানুষে যে ইউনিটি আর থাকে না। কেননা কৃষি ও কৃষকের সম্পর্ক বিনিময়ের সম্পর্ক যা বাজার থেকে আসে না। যদি আসে তবে সেটা পারস্পারিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক নয়, নৈর্ব্যত্তিকভাবে ক্রেতা-ভোক্তার সম্পর্ক। পারস্পারিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি হয় পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা আর সম্মান প্রকাশের ভেতর দিয়ে।
এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক শুধু মানুষে মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই নির্ভরশীলতা প্রাকৃতিক উপদানের মধ্যে রয়েছে। রয়েছে পেশার বৈচিত্র্যতার মধ্যেও। যদি কৃষি ভালো না থাকে তাহলে মাছ থাকবে না। আর মাছ যদি না থাকে বাঁশ-বেত শিল্প থাকবে না। এই বাঁশ-বেঁত শিল্প যে সমস্ত উপকরণ বানায় সেগুলো বেশিরভাগই লাগে মাছ ধরা এবং কৃষি ক্ষেত্রে। কৃষির মতো মৎস্যও যদি বাণিজ্যিক হয়ে যায় তাহলে বাঁশ-বেঁত শিল্পও হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে কুমার। কারণ কৃষির সাথে মাটির যে সম্পর্ক; বীজের সাথে মাটির যে সম্পর্ক সেটি হারিয়ে গেলে মাটির গুনগত মান নষ্ট হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে কাজের ক্ষেত্র তৈরি না হওয়া। যেহেতু এখানে জনসংখ্যা বেশি সেহেতু এখানে কাজের চাহিদাও বেশি। আর কাজের সংকট তৈরি করতে হবে রাখতে হবে মুক্তবাজার অর্থনীতির ব্যবসায়িক স্বার্থে। প্রতিদিন কৃষি, মৎস্য, বাঁশ-বেঁত শিল্পের মতো অসংখ্য কাজের ক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে মানুষগুলো কী করবে বা তাদের কী ধরনের কাজ সরবরাহ করা হবে। কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে একটার সাথে আর একটার আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে। আর যখন এই আন্তঃসম্পর্ক থাকছে না তখন তৈরি হচ্ছে সমস্যা। আমরা তখন হয়ে যাচ্ছি ব্যবসায়ী। আর তখনই বাজার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ অর্ন্তভূক্ত থাকে প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। কিংবা এভাবে বলা যায় সকল জ্ঞানের উৎপত্তি এই প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে। কিন্তু যখন এই প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর না থেকে সবাই বাজারনির্ভর ব্যবসায়ী হয়ে যাচ্ছি তখন আর নতুন জ্ঞান উৎপাদন হচ্ছে না। আর এই জ্ঞান যখন একটা কমিউনিটি থেকে উৎপাদন হচ্ছে না তখন এই জায়গাটা দখল করছে বাইরে থেকে আগত মানুষ, প্রযুক্তি এবং কোম্পানি।
এর ফলে কৃষক, জেলে এবং বাঁশ-বেত শিল্পীর মধ্যকার যে আন্তঃসম্পর্ক সেটি না থাকলে কোনভাবেই কেউ টিকবে না। শুধু মাছ বাঁচিয়ে জেলেকে রক্ষা করা যাবে না; যদি না ভিন্ন ভিন্ন মাছ না থাকে তাহলে সেই ভিন্ন ভিন্ন মাছ ধরার জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ থাকবে না। ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ থাকবে না; যদি না কৃষকের বাঁশ-বেঁত এর জন্য আলাদা জায়গা না থাকে। এই আন্তঃসম্পর্ক ঘুরে ফিরে বারবার আসে শেষ হয় কৃষিতে। তাই সবার আগে এই দেশের নিজস্ব কৃষি ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে।
এই ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে এই প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার যে আন্তঃসম্পর্ক, আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং আন্তঃবিনিময়কে বজায় রাখতে হবে। তাই কৃষিকে রক্ষা করতে হলে শুধু কৃষি বা কৃষক দিয়ে হবে না। কৃষি বা কৃষকের সাথে সাথে জেলেকে রক্ষা করতে হবে। জেলেকে দিয়ে জেলে রক্ষা হবে না যদি কোন মাছ ধরার জন্য কি ধরনের জিনিস দরকার- তা না থাকে। তাই এই ব্যবস্থার জন্য প্রতিটি জায়গাকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সাথে এদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক এবং আন্তঃনির্ভরশীলতাকে শক্তিশালী করতে হবে। তখনই বারসিক এর বিভিন্ন পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলো সামনে চলে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষক সংগঠন, জেলে সংগঠন, বাঁশ-বেঁত সংগঠন, মাটিকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর সংগঠনসহ অন্যান্য সংগঠন গড়ে উঠেছে।
বারসিক শুরু করেছিল শুধু কৃষি দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে কৃষি কিন্তু শুধু কৃষি থাকেনি। বীজ কিন্তু শুধু বীজ থাকেনি। এটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল যে কোন একটি গ্রামের সমগ্র বিষয়ই অর্ন্তভুক্ত হয়েছে। তাই বারসিক এর কাছে কৃষি কক্ষনোই শুধুমাত্র উৎপাদনের বিষয় না। কৃষি সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়। সামাজিক বন্ধনের বিষয়। কৃষি হচ্ছে পরিবেশ এবং প্রতিবেশের বিষয়। কৃষি হচ্ছে প্রাণ বৈচিত্র্যের বিষয়।
তাই বারসিক কৃষিকে কেন্দ্র করে একটি গ্রামের সকল বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকে। কৃষি কেন্দ্রিক অন্যান্য কার্যক্রমগুলো শুধুমাত্র উৎপাদনকে নয়; মানুষে মানুষে আন্তঃসম্পর্ক, আন্তঃনির্ভরশীলতাকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

বীজ বিদ্যাপীঠের অনেকগুলো ‘না’

শিক্ষা জীবনে শিখে ছিলাম ‘রিজিড’ (rigid) হওয়া যাবে না। উদার হতে হবে, কঠোর হওয়া যাবে না। কিন্তু বীজ বিদ্যাপীঠ এসে শিখলাম কোন একটি দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটু নয় অনেক বেশি রিজিড হতে হয়। বীজ বীদ্যাপীঠে অনেকগুলো ‘না’ শিখবেন।  প্রথম ‘না’ তো আগেই বলেছি ‘এখানে কোক এবং পেপসি খাওয়া নিষেধ’। এগুলো নিষেধ হওয়ার কারণ যতটা না এর স্বাস্থ্যগত দিক তার চেয়ে বেশি। এই কোম্পানি দুটির সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র। পাশপাশি, ইন্ডিয়ায় এই কোম্পানির বিরুদ্ধে ‘নবধান্যিয়া’ সফল আন্দোলনের ইতিহাস। উত্তরাখণ্ডে একটি এলাকায় কোকা কোলা কোম্পানি একটি ফ্যাক্টরি তৈরি করতে গেলে তার আশু প্রভাব পরে এলাকার পানি সম্পদ এবং পরিবেশ এর উপর। সেই সময় নবধান্যিয়া এলাকার জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সেই ফ্যাক্টরি বন্ধ করতে সক্ষম হয়। এখন যাদের বিরুদ্ধে আন্দলোন করা তাদের পণ্য ভোগ করা বা করতে দেয়া স্ববিরোদ্ধিতা। পাশাপাশি এখানে আসা প্রতিটি শিক্ষার্থী এই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রভাব পরে এই রিজিড বা কঠোর হওয়ার বদৌলতে।
দ্বিতীয় না হচ্ছে এখানে থালা-বাসন ধোয়ার জন্য কোন ডিটারজেন্ট বা কোন ক্যামিকেল ব্যবহার করা হয় না। এখানে রিঠা ফলকে পানিতে সিদ্ধ করে এক ধরনের তরল তৈরি করা হয়। সেটিই ব্যবহার করা হয়।
প্রথমেই উল্লেখ করেছি, এই খামারের একটি বড় অংশ আম বাগান। সেই আমবাগানের বেশিরভাগ অংশটাই লিজ দেওয়া। রাতে সেখানে প্রায় পটকার আওয়াজ পাওয়া যেত। হঠাৎ হঠাৎ চমকে যেতাম। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আম বাগানে এই সময় প্রচুর পাখি আসে আর পাখি তাড়ানোর জন্য পটকা (বাজি) ফুটানো হয়। কারণ এই আম বাগানে কোন ধরণের কীটনাশক ব্যবহার নিষেধ। এমন শর্তেই বাগানটাকে লিজ দেয়া হয়েছে। এই কারণে বাজারের থেকে অনেক কম মুল্যেই লিজ দেয়া হয়েছে। আর  আম বাগানের যে অংশটুকু লিজ দেয়া হয়নি সেখানে পাখি তাড়ানোই হয় না। গাছে আমে ভরপুর গাছে বক পাখির আস্তানা। পাখি আম খাচ্ছে তবুও তাড়ানোর জন্য কোন ধরণের আগ্রহই নেই। এই পাখি গুলো আমে পোকা থেকে রক্ষা করছে।
প্লাস্টিক একদমই না। পুরা খামারে প্লাস্টিক না ব্যবহারের এক ধরণের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যতক্ষণ পারা যায় প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয় না। পুরা খামারে কয়েকটি পাপোস এবং টয়লেট পরিষ্কার করার ব্রাশ ছাড়া আর কিছুই প্লাস্টিকের চোখে পরেনি। এমনকি ডাস্টবিনের জন্যও প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয় না।
এই বিশাল খামার চাষা করার জন্য ট্র্যাক্টর নয়। গরু টানা লাঙ্গল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহারের চেয়ে শ্রম, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা ব্যবহারের প্রতি বেশি গুরুত্ব ব্যবহার করা হয়।
এসি কিংবা ফ্রিজ নেই। পানি ঠান্ডা রাখার জন্য মাটির পাত্র। ফ্রিজ এর চেয়ে টাটকা খাবার এবং সবজিকে উৎসাহ প্রদান করা হয়। অন্যান্য খাবার সংরক্ষণের জন্য ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
রাসায়নিক সার, কীটনাশক, দেশীয় জাতের বীজ ছাড়া অন্য কোন বীজ ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসয়নিক সারের পরিবর্তে কেঁচো সার, পিট কম্পোস্ট, ম্যানিওর ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক কীটনাশক এর পরিবর্তে পাখি এবং জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
বীজ ঘরের বীজকে ইঁদুর থেকে রক্ষা করার জন্য বিড়াল পোষা হয়। পাশাপাশি বীজ বিদ্যাপীঠের এলাকায় ধূমপান এবং মদ্যপান একদমই নিষেধ।
এই ধরণের কিছু ‘না’ এর মাধ্যমে বীজ বিদ্যাপীঠ এক অনন্য পরিচয় লাভ করেছে। এই সমস্ত ছোট ছোট বিষয়ের সাথে আপোষ না করার ফলে এটি সারা ভারতে এমনকি সারাবিশ্বে অরগানিক খামারের এক আদর্শ উদাহরণ। সারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী এই বীজ বিদ্যাপীঠ এ ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন কোর্স করতে আসে।

বীজ বিদ্যাপীঠ এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপদ্ধতি

‘নবধান্যিয়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নয়টি শস্য বীজ। নব=৯ আর ধান্যিয়া= শস্যবীজ। এটি একটি জীব বৈচিত্র্য খামার (Bio-Diversity  Firm)। একই সাথে এটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের-নাম ‘বীজ বিদ্যাপীঠ’ ইংরেজিতে বলা হয় ‘Earth University’। এই প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী এটি একটি অর্গানিক বা জৈব কৃষি শিক্ষার আদর্শ স্থান।
বীজ বিদ্যাপীঠ এর শিক্ষার্থী মূলত চার ধরনের।
ক) ইন্টার্ন- যাদেরকে কমপক্ষে ১ মাস বিদ্যাপীঠে অবস্থান করতে হবে।
খ) বিভিন্ন কোর্সের শিক্ষার্থী
গ) স্বেচ্ছাসেবক
ঘ) দর্শনার্থী- যারা এক মাসের কম বিদ্যাপীঠে অবস্থান করে।
এই চার ধরনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম দুই ধরনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন রয়েছে। শিক্ষার ধরণ সম্পূর্ণ হাতে কলমে। শিক্ষার্থীদের আবাসিক অবস্থান বাধ্যতামূলক। দিন শুরু হয় সকাল ৬ টায়। ৬টায় থেকে ৭টা পর্যন্ত মেডিটেশন। ৭টায় ভেষজ চা। এরপর সকাল ৮টা পর্যন্ত বিরতি। এর মধ্যেই অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ করতে হবে। কেননা ৮ থেকেই মূলত শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা শুরু হয়। সকাল ৮ থেকে ৮ টা ৩০ পর্যন্ত সকালের নাস্তা। ৮টা ৪৫ থেকে মর্নিং গ্যাদারিং(সকালের স্মাবেশ)। এই অধিবেশনে অনেক গুলো কাজ করা হয়। প্রথমত, একটি উক্তি এবং সেটির অন্তর্নিহিত বক্তব্য দিয়ে শুরু হয়। তারপর একটি খেলা কিংবা কাজ; যেটি সবাই মিলে যেন করতে পারে। এই অধিবেশনের সবশেষে দিনের সবার একটি প্রার্থনা বা আশা প্রকাশ করা হয়। যেমনঃ আজ যেন বৃষ্টি হয়, গরম যেন কম পড়ে, প্রভৃতি।
সকাল ৯ টায় শুরু হয় ‘শ্রমদান’। এই শব্দটি মহাত্মা গান্ধীর জীবন ও দর্শন থেকে নেয়া। ‘শ্রমদান’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। বীজ বিদ্যাপীঠের কোন একটি অংশকে সবাই মিলে পরিষ্কার করার নামই হচ্ছে ‘শ্রমদান’। এটি অবশ্যপালনীয় একটি কাজ। ১০টা থেকে ১২ টা মূলত হাতে-কলমে বীজ বিদ্যপীঠের খামারে কাজ করা। মাঝখানে ১১টায় রয়েছে চা অথবা শরবতের বিরতি। এই ২ ঘণ্টা কাজ করতে হবে খামারে কীভাবে জৈব উপায়ে চাষাবাদ করা যায় সেই জিনিসগুলো। কোন দিন, জমি প্রস্তুত, কোন দিন বীজ সংগ্রহ আবার কোন দিন চারা বা বীজ বপন। এটা শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে করতে হয় না। খামারের কর্মচারীরা যেদিন যে কাজ করে সেই কাজে সহযোগিতা এবং শিখে নেওয়াই এই অধিবেশনের মূল লক্ষ্য। তবে প্রতিদিন যে খামারের কাজে সহযোগিতা করতে হয় এমনটা নয়। নিজে নিজে শিক্ষার্থীদের কৃষি কাজ করার জন্য রয়েছে আলাদা জায়গা; যার নাম “জ্ঞান গার্ডেন”।
‘জ্ঞান গার্ডেন’ একটি নাশপাতি গাছকে ঘিরে গোলাকার একটি জায়গার নাম জ্ঞান গার্ডেন। এখানে হাতে-কলমে এবং পঠিত বিষয় শিখে প্রয়োগ করার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করা হয় বলে এই বাগানের নাম জ্ঞান গার্ডেন। এই বাগানের কোন কাজই খামারের কর্মচারী করেন না। এখানের সব কাজই করতে হয় এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের। মাঠ প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ বপন এমনকি ফসল উত্তোলন করে বিদ্যপীঠে আগত বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের। একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা হয়তো বীজ বপন করে গেলো আর এক ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এসে হয়তো সেই ফসল উত্তোলন করছে। শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যাপীঠ ত্যাগ করলেও ফোনে কিংবা বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খবর রাখে তাদের জ্ঞান গার্ডেনের ফসলের।
১২ টা থেকে ১টা পর্যন্ত গোসল এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ করার সময়। ১টা থেকে ২ টা দুপুরের খাবার। ২টা থেকে ৩টা বিরতি। ৩টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত ক্লাস বা তাত্ত্বিক আলোচনা। এই সময়ে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়।
৫টায় চা বিরতি এবং ৫ টা থেকে ৮টা পর্যন্ত ফ্রি সময়। এই সময় খেলাধুলা এবং অন্যান্য বিনোদন এর জন্য। ৮টায় রাতের খাবার। ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আড্ডা, আলোচনা, পড়াশুনা। তবে রাত ১০ টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা হচ্ছে নিরব সময়। এই সময় রুমে বসে পড়াশুনা কিংবা অন্যান্য কাজ করা যাবে। তবে অন্য কারো অসুবিধা হয় এমন কোন কাজ করা যাবে না।
এই রুটিন পড়ে মনে হতে পারে এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ-পদ্ধতি কোথায়? বীজ বিদ্যাপীঠ ক্লাস রুমভিত্তিক শিক্ষা দানের চেয়ে হাতে-কলমে এবং উন্মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে শিখুক। তাহলে তাদের মধ্যে এই জানার প্রভাবটা গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে। আপনি হয়তো দুপুরের খাবার খেতে খেতে কারো সাথে জৈব কৃষির বাজারজাতকরণের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললেন। কিংবা বিকালের চা খেতে খেতে জেনে নিলেন বীজ বিদ্যাপীঠের ইতিহাস এবং দর্শন।
সপ্তাহের কোন দিন কোন বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্ব দেয়া হবে সেটিও নির্ধারণ করা আছে এখানে। যেমন ভারতে সপ্তাহ শুরু হয় সোমবারে। আর সোমাবারে শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হবে চিকিৎসা (ভেষজ), মঙ্গলবার বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, বুধবারে দক্ষতা বিনিময়(আপনি হয়তো কোন গান, কিংবা ভালো হাতের কাজ পারেন সেটি সবার সাথে শেয়ার করবেন), বৃহস্পতিবার ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, শুক্রবারে সবাই মিলে রান্না করা, শনিবার মুলত শিক্ষার্থীদের নিজের জন্য (জামাকাপড় পরিষ্কার, নিজের ঘর গোছানো, প্রভৃতি)। আর সবচেয়ে মজার দিন হচ্ছে রবিবার-এদিন শুধুই বিনোদন। ওখনাকার ভাষায় “সানডে-ফানডে”।
এখানকার মূল বিশয়ভিত্তিক আলোচনার জন্য হয়তো নির্ধারিত একজন আলোচক থাকে; তাছাড়া ওখানের সবার কাছ থেকে আপনি শিখতে পারেন। যিনি জমি চাষ করেন তার কাছ থেকে শিখে নেন কীভাবে জমি প্রস্তুত করতে হয়। যিনি বীজ সংরক্ষণকারী তার কাছ থেকে শিখে নেন বীজ সংরক্ষণ এর বিষয় গুলো। পাশাপাশি এখানে রয়েছে পাঠাগার-আপনি ইচ্ছে হলে সেখানে বসে পড়ে নেন যে বিষয়টি সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত জানতে চান।
শেখাটা এখানে তাই পড়া এবং শুনা একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি চর্চা, প্রতিদিনকার নিত্যনৈমিত্তিক কাজের মধ্য দিয়ে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করার বিষয়। আপনি হয়তো কিছু খাচ্ছেন-খাওয়ার মধ্য দিয়ে জেনে নিন কি খাচ্ছেন? কেন খাচ্ছেন? কি খাওয়া উচিত? হয়তো চিন্তা করছেন-এমন কোন চিন্তা করুন যেটি একজন কৃষক করে। পানি খাচ্ছেন খান যেভাবে খাওয়া উচিত-মাটির পাত্রে; বোতলজাত নয়।

কৃষক পেনশন এখন শুধু সময়ের দাবি

বয়স্ক বা প্রবীণ কৃষকদের তাদের দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবদানের স্বীকৃতি এবং পেনশন এর দাবি নিয়ে সম্প্রতি মানিকগঞ্জের প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে হয়ে গেল মত বিনিময় সভা। মত বিনিময় সভায় মানিকগঞ্জ জেলার ৬টি উপজেলার সাধারণ কৃষক-কৃষাণী এবং বিভিন্ন কৃষক সমিতির সদস্য এবং নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভার শুরুতে বারসিক পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বারসিক মানিকগঞ্জ রিসোর্স সেন্টারের আঞ্চলিক সমন্বয়কারি বিমল রায়। তার বক্তব্যে এই দাবির প্রেক্ষাপট এবং যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে সম্পূর্ণ অবদান সরাসরি কৃষকের। কিন্তু কৃষক তার উপাদিত পন্যের ন্যায্য দাম পায় না। সে সবসময় বঞ্চিত হয়, কৃষি পেশাকে মর্যাদা দেবার ক্ষেত্রে আমাদের সরকারি-বেসরকারী পর্যায়ে অনেক সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। একজন কৃষককে চাকুরির জন্য অন্যের কাছে যেতে হয়। তার নিজের কর্মসংস্থান এবং আরো অনেকের কর্মসংস্থান করে।
কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে কৃষি উপাদক কৃষকেরই খাদ্যাভাব শুরু হয়। তাকে খাদ্যের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়। স্বয়ং কৃষকই তার খাদ্যের স্বাধীনতা হারান। খাদ্য উপাদকই যখন খাদ্য প্রাপ্তিতে শংকাগ্রস্ত হন; তখন নতুন নতুন খাদ্য উপাদক তৈরিতে বাঁধাগ্রস্ত হয়। কৃষক কৃষি কাজের প্রতি আগ্রহ হারান। নতুন নতুন কৃষক তৈরি না হয়ে কৃষক সন্তান বিকল্প কর্মসংস্থানে চলে যেতে থাকে। কৃষি ব্যবস্থায় এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করে। বাণিজ্যিক কৃষিতে মানুষ ধাবিত হয়। ফলে কৃষিতে আর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। পুরো ব্যবস্থায় একজন কৃষক ক্রমাগত কৃষি থেকে দূরে চলে যাচ্ছে এবং একই সাথে বঞ্চিত হচ্ছে সকল ক্ষেত্র থেকে।
মানিকগঞ্জ এর কৃষক সমাজের পক্ষ হতে আমাদের আহবান বাংলাদেশের খাদ্য উপাদনে যে কোন প্রতিকুলতার মধ্যেও কৃষকের সক্রিয় ভূমিকা থাকায় প্রবীণ কৃষকের খাদ্য ও চিকিসা নিরাপত্তার লক্ষ্যে তার প্রবীণ অবস্থায় রাষ্ট্রকর্তৃক স্বীকৃতি হিসেবে ‘কৃষক পেনশন’ চালু করা অতি জরুরি’।
আলোচক এর বক্তব্যে বারসিক এর নির্বাহী পরিচালক সুকান্ত সেন জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষকের অবদান থাকা স্বত্বেও কীভাবে প্রতি পদে পদে প্রতারিত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে সে বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “সরকার যেমন কৃষি ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়, ঠিক তেমনি একজন কৃষকও ভর্তুকি দেন।” তিনি বলেন, “একজন কৃষক তার ফসলের উপাদন মুল্য এবং বিক্রয়মুল্যের ক্ষেত্রে প্রতিমণে প্রায় ২০০ টাকা ভর্তুকি দেয়। সে হিসেবে রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি ভর্তুকি দেন একজন কৃষক। কিন্তু তার এই অবদানের যেমন কোন প্রতিদান দান দূরে থাক স্বীকৃতিও নেই!
অন্যদিকে বাণিজ্যিক কৃষির ফলে কৃষক প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসবে তিনি বলেন, “একজন কৃষক উপাদন করেন ২৮ জাতের ধান। এই চালের বাজারমূল্য ২৫-৩৫ টাকা। কিন্তু এই চালই মধ্যস্বত্ব ভোগীরা মেশিনে কেটে মিনিকেট নাম দিয়ে বিক্রি করছে; আর জার বাজার মূল্য ৪০-৫০ টাকা। কিন্তু এরা কোনভাবেই উপাদক নয়; কিন্তুই তারাই লাভবান হচ্ছে। একই সাথে প্রতারিত হচ্ছে তাদের উপাদিত ২৮ ধানের নাম থাকছে না হয়ে যাচ্ছে মিনিকেট। আমরা ভোক্তা শ্রেণীও হচ্ছি প্রতারিত।
সুকান্ত সেন তাঁর আলোচনায় বলেন, নতুন প্রজন্ম যেমন কৃষক হিসেবে পেশাকে বেছে নিচ্ছে না; তেমনি বয়স্ক কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন দীর্ঘ দিন ধরে কৃষি কাজকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ২০ বছর আগে যেখানে কৃষকদের গড় বয়স ছিল ৬০ থেকে ৬৩ বছর। বর্তমানে এখন সেটি ৭৫-এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবীণ হিসেবে একদিকে যেমন রয়েছে বার্ধ্যকের শারীরিক-মানসিক কষ্ট। সেখানে আবার বাড়তি খাদ্যের চাহিদা চাপিয়ে দিচ্ছি। আমাদের খাবারের নিশ্চয়তা চাপিয়ে দিচ্ছি এই সমস্ত প্রবীণ কৃষকদের। তিনি বলেন, “তাই এই কৃষকদের জন্য কৃষক পেনশন এখন সময়ের দাবি। সরকার যে প্রবীণ ভাতা দেয় সেটা যেমন সকল কৃষক পায় না। ঠিক তেমনি সেটি যথেষ্টও নয়। প্রবীণদের এক মাসের ওষুধের খরচই হয় না। তাই কৃষকদের স্বীকৃতির জন্য আমরা কৃষকদের পেনশনের দাবটাকে জাতীয়ভাবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছি।”
অন্যদিকে এ্যডভোকেট আজহারুল ইসলাম আরজু বলেন, “কৃষকরাও যে তাদের উপাদিত শস্যে ভর্তুকি দেয় সেটি যেমন সরকার জানায় না। তেমনি কৃষকরা নিজেরাও জানে না। অন্যদিকে সরকার যে সমস্ত ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয় সেটি সরাসরি কৃষকের কাজে আসে না। সরকার ভর্তুকি দেয় সার, বিষ, তেল এবং ট্রাক্টরে। এগুলো তো কৃষকের লাভবান করে বরং গ্রামে এক ধরণের ব্যবসায়ীদের সৃষ্টি করছে। গ্রামে গ্রামে কলের লাঙলের ব্যবসায়ী, পানি, বীজ, বিষ, তেল সব কিছুর ব্যবসয়ী আছে। কৃষকদের এই সব কিছু এই সমস্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনতে হয়। আমরা দাবি করছি না যে সব কৃষককে একসাথে এই পেনশন দিতে হবে। কিন্তু সীমিত আকারে হলেও শুরু করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।”
তিনি বলেন, “এই দাবির জন্য একটি সার্বজনীন কমিটি করতে হবে-আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য। প্রথমে জেলা পর্যায়ে এই ধরনের দাবি তুলে ঢাকা পর্যায়ে একটি কনভেনশন করতে হবে। জাতীয়ভাবে একটি আন্দোলন কমিটি করতে হবে। কৃষক পেনশন এখন শুধু সময়ের দাবি।” মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চক্রবর্তী বলেন, “কোন দাবিই অযৌক্তিক নয়। এখনকার সবকিছুই আন্দোলন সংগ্রামের ফল। অনেকেই বলতে পারেন-কৃষকদের জন্য আবার পেনশন কেন? একসময় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা প্রভৃতি ছিল হাস্যকর। কিন্তু এখন তো সব স্বাভাবিক। একসময় কৃষকদের পেনশনও স্বাভাবিক হিসেবে মনে হবে। সাংবাদিক হিসেবে এই দাবির সাথে একাত্মতা জানাচ্ছি।
কৃষক নেতা সেতোয়ার হোসেন বলেন, “পাফাটা মেহনতি কৃষকের কিছু নেই। আমরা কৃষকরা বিপদে পড়েছি। কৃষক পেনশন অত্যন্ত জরুরি। সরকার কি করবে জানি না। তবে আমাদের এই অধিকার আদায়ের জন্য জোট বাঁধতে হবে।
রাষ্ট্রপতি পদক প্রাপ্ত প্রবীণ কৃষক শরীফ আলী বলেন, “মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি সার, বীজ, কীটনাশকসহ সবকিছুতে দখল করে আমাদের পরনির্ভরশীল করে তুলছে। কাঠের লাঙলের জায়গা দখল করেছে ইঞ্জিন লাঙ্গল। কৃষি ক্ষেত্রে নেই কোন ব্যবস্থাপনা। আমরা যারা কৃষক তারা আজ হযবরল অবস্থাতে আছি। ৬০ বছর পরে আমাদের যখন কর্মসংস্থান থাকবে না-তখন আমদের কি হবে? তাই কৃষক পেনশন প্রথা অবশ্যই চালু হওয়া দরকার।
কৃষক নেতা দুলাল বলেন, “কৃষক পেনশন এর দাবি কিছুটা ব্যতিক্রম লাগলেও; এটি এখন সময়ের দাবি। সারা দেশে নিয়মিত ও অনিয়মিত কৃষক আছে প্রায় ৬ কোটি। বিপরীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে মাত্র ১২ লাখ। ৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনা না করে সরকার ১২ লাখকে বড় করে দেখছে। কৃষকের পেনশনের জন্য বাজেটে কৃষি ক্ষেত্রে বেশি বরাদ্দ করতে হবে। কৃষকের পেনশন দাবিকে জোরদার করার জন্য হাট বাজার, গ্রাম সভায় প্রচারণা চালিয়ে আরো মানুষকে সচেতন করতে হবে।”
কৃষাণী সাফিয়া বেগম বলেন, “যখনই কোন সুবিধা আসে সেটি কেউ পায়, কেউ পায় না। সবাই যেন পায় সে বিষয়ে সরকারকে দেখতে হবে। সরকারের কাছেই একটাই দাবি কৃষকদের যেন মূল্যায়ন করে, দাম দেয়।”
কৃষক আব্দুস ছালাম বলেন, “গরিব বয়স্করা বয়স্ক ভাতা পায়। কিন্তু সকল কৃষক সেই ভাতার আওতায় আসে না। তাই কৃষকদের পেনশন আমাদের জন্য খুব জরুরি। একজন চাকরিজীবী ২০-৩০ বছর কাজ করলেই পেনশন পায়। কিন্তু আমরা ৪০-৫০ বছর ধরে এত কিছু করলাম। কিন্তু আমাদের (পেনশন) কই? আমরা সকল গ্রামের কৃষকরা যদি একসাথে কথা বলতে পারি তাহলে আমাদের এই দাবী সরকারের কাছে পৌঁছাতে পারবো।”
আলোচক মোসলেমউদ্দিন বলেন, “আমাদের সবকিছু আজকে না হয়ে কালকে হলেও চলে। কিন্তু খাদ্য না হলে চলে না। আর এই খাদ্য যারা যোগান দেয় সেই কৃষক একটা বয়সের পরে তার নিজেরই খাদ্য থাকে না। তাই প্রবীণ কৃষকদের জন্য আমরা কৃষক পেনশন দাবি করছি। আমরা আমাদের টাকা থেকেই আমাদের পেনশন দাবি করছি। আমরা প্রতিদিন জিনিস কিনে যে ভ্যাট ও ট্যাক্স দেই সেখান থেকে সঞ্চিত অর্থ থেকেই-কৃষক পেনশন চাচ্ছি।
কৃষক লীগ এর সদস্য সচিব জাগীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ বলেন, বয়স্ক ভাতা আছে কিন্তু কৃষক হিসেবে আলাদা কোন ভাতা নেই। ৬০ বছরেই ভাতা দিতে হবে এমন কোন দাবি আমরা করছি না। ৬০ বছরে না দেন ৭০ বা ৭৫ দেন। পদক্ষেপটা ভালো, সফল হলেও আরো ভালো।

“পুরাতন জিসিন কি ডিম পাড়ে?”- আসুন বেঁচে দিই!

বছরখানিক আগে টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন বেশ চোখে লেগেছিল, কানে বেজেছিল। আর সেটি হল বিক্রয় ডটকমের ‘পুরনো জিনিস কি আর ডিম পাড়ে? ছবি তুলুন, পোস্ট করুণ আর বেচে দিন’। একই সময়ে ভারতীয় টেলিভিশনগুলোতে একই ধরণের বিজ্ঞাপন ‘পুরনো জিনিস কে ধরে না রেখে বেচে দিন।’-OLX.COM এর। সত্যিই তো পুরনো জিনিস কি ডিম পাড়ে? সুতরাং তাকে বেচে দিন?
পুরনো জিনিসের কি ডিম পাড়া ছাড়া আর কোন মূল্য নেই? আপনার বাবার দেয়া জীবনের প্রথম ‘ঘড়ি’; হাতে দিতে পারেন না-ওল্ড ফ্যাশান বলে! কি আর করা বেচে দিন। আপনার বিয়ের প্রথম লাল টুকটুকে ৪০ বছরের পুরনো শাড়ী-কি আর কাজে লাগবে? বেঁচে দিন। আমার বাবার একটি ৩৭ বছরের পুরনো সাইকেল আছে-আমারই চালাতে বেশ কষ্ট হয়। তবু বাবা সাইকেলটা এখনো চালান। সাইকেলটা তার শ্বশুর তার বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। সাইকেলটা তো আর নতুন সাইকেল দেবে না! বরং মেইনটেনেন্সের জন্য প্রতিনিয়ত খরচ হবে। আমার বাবা কি সেটা বেচে দেবে? বেঁচে থাকতে তো নয়ই।
পুরনো মূল্যবোধ, সংস্কার, ভালোবাসা, বিশ্বাস-আস্থা ধরে রেখে লাভ কি বেচে দিই। ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছি, শুনে এসেছি, শিখে এসেছি এবং বেচে এসেছি পুরনো জিনিস। পুরনো ছেড়া-ফাটা, ভাঙ্গাচুরা জিনিস দিয়ে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে চকলেট, আইসক্রিম, পাঁপড় ভাজা কিংবা বিনিময়ে মা-চাচীরা নিয়েছে ঘরের প্রয়োজনীয় হাড়ি-পাতিল। এগুলোর কি কোন প্রভাব নেই আমাদের জীবনে? এর বিন্দুমাত্রা রেশ কি নেই আমাদের মগজে?
এগুলো দেখতে-দেখতে, শুনতে-শুনতে আর করতে করতে যখন আমাদের নিজেদের জীবনে কোন পুরাতন, বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ ঘরের মানুষকে দেখি-যারা হয়তো আপনার আমার বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানী যারা সারাদিন ঘরের কোনে বসে থাকে; ডিম পাড়ার জন্য। কিন্তু দিন শেষে কোন ডিমই পারে না। তখন কি বলতে ইচ্ছে করে না-ধুর এই বুড়া গুলো তো ঘরে বসে ডিমও পারে না; বেঁচে দিই বিক্রয় ডট কম কিংবা ওএলএক্স ডট কমের মতো কোন কম্পানি কিংবা ফেরিওয়ালার কাছে। জায়গাও বাঁচল, ঝামেলাও কমলো। সেই ফেরিওয়ালা হয়তো কোন ওল্ড এজড হোম কিংবা বৃদ্ধাশ্রম। কিংবা আমাদের বৃদ্ধ মানুষ বেচার মতো কোন কোম্পানি নেই বলে হয়তো ফেলে রাখি বাড়ির সবচেয়ে অন্ধকার ঘুপচি ঘরটিতে। কোন যত্ন নেই, আদর নেই, খোঁজ খবর নেই। পুরনো মানুষটার পিছনে যে অর্থ আর ওষুধ খরচ হয় সেটাও বুঝি বৃথা অপচয়।
ভাবছেন আমার কথার কোন ভিত্তি নেই। ভেবে দেখুন, আপনার বাসার পুরাতন দৈনিক পত্রিকাগুলো কি করেন ফেলে রাখেন সবচেয়ে অন্ধকারের ঘুপচিতে। তারপর যখন আর জায়গা হয় না তখন বেঁচে দেন কাগজওয়ালার কাছে। বাসার যত পুরাতন অব্যবহার্য, কাজে লাগে না এমন জিনিস আপনি কি বেঁচে দেন না একেবারে নামমাত্র মুল্যে? তাহলে ঠিক সেই একই আচরণ কি করেন না বাড়ির সবচেয়ে পুরাতন সদস্য-যিনি কোন কাজের না, বাসার জায়গার অপচয়। হয়তো সে আপনার আপনজন বলে বেচতে পারছেন না। কিংবা বেচার কোন সুযোগ নেই বলে হয়তো। জানি না যদি কোন দিন সুযোগ তৈরি হয়-তাহলে আমিও হয়তো বেচে দিতে পারি আমার পরিবারের পুরাতন সদস্যকে!
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে বাসার পুরাতন জিনিস আর পুরাতন/বৃদ্ধ মানুষ কি এক? নিশ্চয় না। কিন্তু এই যে পুরনো জিনিসের প্রতি আমাদের দীর্ঘ দিনের আচরণ, অভিব্যক্তি, ব্যাখ্যা কি কোন প্রভাব ফেলে না আমাদের মানুষের সাথে আচরণ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে? বা আমাদের মনস্তত্ত্বে? যদি আপনার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়। তাহলে অবশ্যই সেটা মারাত্মক।
দ্বিতীয় আর একটি প্রশ্ন মাথায় আসতে পারে। এই পুরনো জিনিসগুলো নিয়ে আমরা কি করবো? কোন কাজে লাগে না আবার অনেকখানি জায়গা নষ্ট হয়। বেচে দিলেই তো ভালো। একবারও কি ভেবেছেন আপনার এই পুরাতন, অকাজের জিনিসগুলো যারা নামমাত্র মুল্য দিয়ে কিনে নেয়- তারা কি করে? তারা কি আপনার মতো ফেলে রাখে? কক্ষনো নয়। সেটাকে কাজে লাগায়, ব্যবহার করে। কক্ষনো একটু মেরামত করে কিংবা একবারে রিসাইকেলিং করে ভিন্ন কিছু তৈরি করে ব্যবহার করে। কিন্তু আপনি কি কক্ষনো আপনার পুরাতন জিনিসটাকে রিসাইকেলিং করে ব্যবহার করার কথা ভেবেছেন? কিংবা আপনার সন্তানককে কি শিখিয়েছেন? যদি উত্তর ‘না’ হয় তাহলে-সে কীভাবে শিখবে যে পুরাতন জিনিসেরও মূল্য আছে। পুরাতন জিনিসের যেমন মূল্য আছে তেমনি মূল্য আছে আপনার পরিবারের সবচেয়ে পুরাতন সদস্যেরও। তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং দেখাশুনার অশেষ মূল্য আছে আপনার এবং আপনার পরিবারে।
আপনার পরিবারের সকলেই ব্যস্ত। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যকে সময় দেয়ার কেউ নেই। আপনার পরিবারের প্রবীণ সদস্য হতে পারে সবচয়ে কার্যকরী। আপনার বাসায় কাজের লোক আছে কিন্তু আপনার স্কুল পড়ুয়া ছোট সন্তানকে বাসায় রেখে যেতে পারছেন না। শুধু যদি একজন প্রবীণ সদস্য থাকে তাহলে এই জটিল সমস্যার সমাধান নিমিষেই হবে। আপনার ছোট কংক্রিটের বাসাটা সবুজ আর প্রাণে ভরে তুলতে পারেন প্রবীণ সদস্যটি। নাগরিক ব্যস্ততা আর সমস্যায় একবারে বিপর্যস্ত। একটুও শান্তি পাচ্ছেন না। কারোর সাথে শেয়ার করতে পারছেন না। আপনার প্রবীণ অভিজ্ঞ বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি অথবা শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে একটু সময় কাটান, মন খুলে গল্প করুন। জানি তিনি হয়তো আপনার সমস্যার সমাধান করে দেবেন না। কিন্তু আমি নিশ্চিত আপনি কিছু অনুপ্রেরণা আর সাহস পাবেন। নতুন আত্মবিশ্বাসে ভরে উঠবেন। হয়ে উঠবেন এক নতুন আপনি।
একটু ভাবুন বাড়ির পুরাতন জিনিসটার যেমন হয়ে উঠতে পারে মূল্যবান। ঠিক তেমনি আপনারা পরিবারের প্রবীণ সদস্যও কম মুল্যবান নয়। আপনিও যেমন বিষয়টা আমল করবেন। তেমন করে শেখান আপনার সন্তানকেও। নতুবা আমি আপনিও হয়ে যাবো প্রবীণ-পুরাতন এক বৃদ্ধ। তখন আপনার আমার সন্তান যেন আমাদেরকে পুরাতন ভেবে বেচে না দেয়-‘ডিম পাড়ি না বলে!’

আপন রঙ

আপন রঙ এ হাত রাঙ্গিয়ে,
তোর গালটা আলতো ছুই।
সব রঙ্গকে ছাপিয়ে পাগলী-
গোধুলী রাঙা আকাশ যে তুই।

ছড়া-৩

ঘাস ফড়িং এর জন্য আমার মনটা কেমন করে-
মাঝে মাঝে হঠাৎ আসিস ধূসর সফেদ ঘরে।
সিন্ধু আমি বিন্দু খুঁজি ধূ ধূ মরুর বুকে-
আমি কেবল কেঁদে মরি অস্থির অজানা শোকে।

ছড়া-২

আমি যদি হারিয়ে যাই- বিলিন হই তোর বুকে, 
লেগে আছে চুমুর স্বাদ-বিস্বাদ হয়ে অমলিন এই ঠোটে।